ইসলামে যাকাত দানের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু একটি দানের ব্যবস্থা নয়; বরং এটি ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য ফরজ ইবাদত।যাকাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা হয়, সম্পদ পরিশুদ্ধ হয় এবং সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। তবে দুঃখজনকভাবে, সমাজে যাকাত প্রদান এবং গ্রহণের ক্ষেত্রে দুটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়—
এক- যিনি যাকাত দেন, তিনি করুণার দৃষ্টিতে দেখেন।
দুই- যিনি যাকাত গ্রহণ করেন, তিনি নিজেকে ছোট মনে করেন।
এই দুটি মনোভাব ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী এবং যাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
এক- যাকাত প্রদান: করুণা নয়, এটি দায়িত্ব
বহু মানুষ মনে করেন, যাকাত দেওয়া মানে গরিবদের প্রতি করুণা করা বা দান-খয়রাত করা। অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন—
❝তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।❞
(সূরা আত-তাওবা: ১০৩)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যাকাত দেওয়া মানে কেবল অভাবীদের সাহায্য করা নয়; বরং এটি ধনী ব্যক্তির সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করার মাধ্যম।
কেন যাকাত করুণা নয়?
আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ বিধান:
যাকাত দেওয়া কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি ইসলামের ফরজ বিধান। একজন ধনী ব্যক্তি চাইলে যাকাত দেবেন আর না চাইলে দেবেন না—এমন নয়।
বরং যদি তার সম্পদ নিসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছর অতিক্রম করে, তাহলে তিনি অবশ্যই যাকাত দিতে বাধ্য।
অন্যের হক আদায় করা:
যাকাত শুধুমাত্র ধনী ব্যক্তির দান নয়; বরং গরিবের প্রাপ্য হক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন— ❝তাদের সম্পদে নির্ধারিত অংশ রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য।❞ (সূরা আয-জারিয়াত: ১৯)
যাকাত না দিলে শাস্তি:
যাকাত আদায় না করলে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। আল্লাহ বলেন— ❝যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, আপনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন।❞ (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)
সুতরাং, যাকাত দেওয়া কোনো উপকার বা দয়া নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত দায়িত্ব, যা আদায় করতেই হবে।
দুই-যাকাত গ্রহণ: লজ্জার নয়, এটি অধিকার-
অপরদিকে, যারা যাকাত গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে অনেকে এটিকে লজ্জাজনক মনে করেন বা নিজেদের ছোট মনে করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি মোটেও অপমানজনক কিছু নয়। বরং যাকাত গ্রহণ করা একটি অধিকার, যা আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
কেন যাকাত গ্রহণ লজ্জার কিছু নয়?
যাকাতের অর্থ গরিবদের প্রাপ্য: আল্লাহ কুরআনে বলেন— ❝যাকাত তো কেবল দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত, এর উপর কর্মচারী, যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করা হয়, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য— এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান।❞ (সূরা আত-তাওবা: ৬০)
নবী (সা.) নিজে যাকাতের হকদারদের উৎসাহিত করেছেন:
একজন সাহাবি নবীজির (সা.) কাছে এসে সাহায্য চেয়েছিলেন। তিনি প্রথমে তাকে পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু যখন এটি সম্ভব হয়নি, তখন তিনি তাকে যাকাত গ্রহণ করতে বলেন।
যাকাত গ্রহণ ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার অংশ:
যাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নত করা, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করা ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। সুতরাং, যাকাত গ্রহণ করা কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং এটি একটি প্রাপ্য হক, যা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি: করুণা নয়, বরং দায়িত্ব ও অধিকার-
ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাত এমন একটি ব্যবস্থা যা সমাজে ধনী ও গরিবের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে। তাই আমাদের উচিত সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যাকাত প্রদান এবং গ্রহণ করা-
যিনি যাকাত দেন; তিনি যেন এটিকে করুণা বা দয়া মনে না করেন। তিনি যেন বুঝতে পারেন যে, এটি তার উপর ফরজ এবং গরিবের হক। তিনি যেন মন থেকে এই দায়িত্ব পালন করেন এবং গরিবদের সম্মানের সাথে যাকাত প্রদান করেন।
যিনি যাকাত গ্রহণ করেন; তিনি যেন নিজেকে ছোট না মনে করেন, বরং এটিকে তার ন্যায্য অধিকার হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি যেন এটিকে গ্রহণ করে আত্মমর্যাদা বজায় রাখেন এবং নিজেকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করেন।
যাকাতের অর্থ যেন সঠিকভাবে ব্যয় করেন, যাতে ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। যাকাত ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এটি ধনী-গরিবের মধ্যে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।
সুতরাং, যাকাত প্রদানকারী যেন এটিকে করুণা না মনে করে, বরং এটি তার ওপর ফরজ দায়িত্ব হিসেবে দেখে। অপরদিকে, যাকাত গ্রহণকারী যেন নিজেকে ছোট না মনে করে, বরং এটিকে তার ন্যায্য অধিকার হিসেবে গ্রহণ করে।
যদি সমাজের প্রতিটি মানুষ যাকাত সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, তবে ধনী-গরিবের বিভেদ কমে আসবে এবং একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।
লিখেছেন-
মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান
মুহতামিম, হাজীপুর মদিনাতুল উলুম মাদরাসা, চৌমুহনী, নোয়াখালী।
সম্পাদক : মাহমুদুল হাসান (রুদ্র মাসুদ)
ঠিকানাঃ ৮৬-৩২ ১০২ এভিনিউ, ওজন পার্ক, দ্বিতীয় তলা, নিউ ইয়র্ক, এনওয়াই-১১৪১৬, ইউএসএ
© 2025 Deshi Khobor All Rights Reserved. Developed By Root Soft Bangladesh.